Home >> Story >> নাটক

শিল্পসংস্কৃতি

নাটক

শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

  •  ‘রাজযোটক’ ও ‘ ফিরে দেখা’

    শৈলিক নাট্য সংস্থা ফিরিয়ে এনেছে মঞ্চে প্রায়-ব্রাত্য হয়ে যাওয়া কমেডি। অপর নাটকটিতে আছে আত্মশুদ্ধির ছবি।

    সাম্প্রতিক বাংলা নাটকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্লট-এর শব্দে-বাক্যে-ভাবনায় বড় বেশিরকম উপস্থিত থাকে, সূক্ষ্মভাবে তা উপস্থাপিত হওয়ার পরিবর্তে, অনেকসময়ই সে নাটক হয়ে ওঠে ডাইড্যাক্টিক।

    শৈলিক নাট্য সংস্থা নতুন দু’টি প্রযোজনায় সে পথে হাঁটেনি, বরং মঞ্চে প্রায়-ব্রাত্য হয়ে যাওয়া কমেডি ফিরিয়ে এনেছে ‘রাজযোটক’ নাটকে, যেখানে তিনটি চরিত্র ধরে রাখে গতি ও সমতা- চ্যাটার্জিমশাই, বিন্দু ও সদানন্দ। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও সম্প্রদায়ের (বিন্দুর ভূমিকায় কণ্ঠ দিয়েছিলেন অভিনেত্রী গীতা দে) বুদ্ধিদীপ্ত স্কিট-এর সৌজন্যে ‘রাজযোটক’-এর গল্প অধিকাংশ লোকেরই জানা, যার মূল আবার রয়েছে আন্টন চেকভ-এর ‘দ্য প্রোপোজ়াল’ নাটকে। এই সূত্রোল্লেখটি মঞ্চের ঘোষণায় করা হলে ভাল হত।

    সদানন্দ ও বিন্দু দু’জনেরই পরস্পরকে বিয়ে করার সাধ, কিন্তু পরস্পরের মনের ইচ্ছেটি অত সহজে ব্যক্ত হয় না। কখনও জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে বা দু’জনের পোষা কুকুরের মধ্যে কোনটি বেশি তেজি তাই নিয়ে শুরু হয়ে যায় তুমুল তরজা। ফলে মূল কথাটি বলতে পারার আগেই আলোচনার মোড় ঘুরে যায় সম্পূর্ণ অন্যদিকে। এই মুহূর্তগুলিতেই পাওয়া যায় কমেডির উপাদান। বিন্দুর বাবা চ্যাটার্জিমশাইও কখনও দু’জনের ঝগড়ায় বিন্দুর পক্ষ নিয়ে সদানন্দকে আরও রাগিয়ে দেন, এমনকী গায়ে হাত তুলতেও পিছপা হন না, অথবা তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। নাটকটির উপস্থাপনায় গৌরীদাস বসাক (চ্যাটার্জিমশাই), অন্তিকা চট্টোপাধ্যায় (বিন্দু) এবং প্রবীর বসু (সদানন্দ)- তিনজনেই সাবলীল, স্বচ্ছন্দ।

    এই ধরনের নাটক একটু চড়া সুরেই বাঁধা থাকে, সংলাপ বলার ধরনেও চলে আসে যাত্রার ঢং, তবু এঁদের অভিনয়ে যেহেতু কোনওরকম বাড়াবাড়ি ছিল না, রমেন লাহিড়ি রচিত নাটকটির কোনও মুহূর্তই দর্শকের কাছে তাই বিসদৃশ বা শ্রুতিকটু হয়ে ওঠেনি।

    বিরতির পর অভিনীত হয় চন্দন সেন-এর লেখা ‘ফিরে দেখা’। এই নাটকটিতেও মুখ্য ভূমিকায় হারুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রবীর বসু এবং সত্যি বলতে কী, প্রবীরবাবু ছাড়া আর সকলেরই অভিনয় কিঞ্চিত্‌ দুর্বল। নাটকটিতে যে-আত্মশুদ্ধির ছবিটি দর্শক দেখতে পান, সেটি অভিনব কিন্তু অবাস্তব। বিমলেশ (তপন কুণ্ডু) ও নীলিমার (শ্যামলী আদক) পরিবারে আশ্রিত হারু হঠাত্‌ই বলতে শুরু করে, সব জানি, সব বুঝে গেছি, মাস পয়লায় হাঁড়ি ফাটাব, ফাটাবই! কিন্তু কখনওই ভেঙে বলে না, কী সে জানে বা বুঝে গেছে। ক্রমশ অন্যেরাই ভেঙে পড়ে হারুর সামনে, কনফেশন-এর মতো জানিয়ে দেয়, বিমলেশ-নীলিমার ছেলে আসলে ভিড়ে গিয়েছে ব্যাঙ্ক ডাকাতের দলে, তাদের মেয়ে ভালবাসে এমন একটি ছেলেকে, যে মদের দোকান চালায়, তাই তার পরিবার মেনে নেবে না, এই ভয়ে যে-তথ্য সে গোপন রেখেছিল এতদিন। এমনকী, বিমলেশ ও নীলিমা যে খুন পর্যন্ত করেছেন, সেকথাও জানতে পারেন দর্শক।

    এই পন্থায় চরিত্রগুলির মানসিক টানাপড়েনটি ধরা পড়ে ঠিকই, কিন্তু একটি ছোট পরিবারে এতজন দুষ্কৃতীর উপস্থিতি অবাস্তব নয় কি! এমনকী বিমলেশের পুলিশ-বন্ধু সান্যালও (শান্তনু চট্টোপাধ্যায়) স্মাগলিং-এর সঙ্গে যুক্ত!

    যা এতদিন ছিল আড়ালে, সেই সব গোপন কথাই প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তাই হারুর হাঁড়ি ফাটানোর আর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু পরিবারটিতে সে থেকেও যায় না, মাস পয়লাতেই হারু অন্তর্হিত হয়। এবং অবশ্যই সকলের মনে বোধোদয় জাগিয়ে দেয়। নিজেদের জীবনকে ফিরে দেখা-র মধ্য দিয়ে আসে উপলব্ধি। তপন সিংহর ‘গল্প হলেও সত্যি’র ধনঞ্জয়ের কথা মনে পড়ে।

    নাটকদু’টির সমগ্র পরিচালনায় ছিলেন রূপক সেনগুপ্ত।

You may like