গ্রন্থলোক

জীবনমন্থনজাত প্রগাঢ় অনুভূতিমালা

ঊর্মি রায়চৌধুরী

  • উপন্যাস সমগ্র

    প্রথম খণ্ড

    সেলিনা হোসেন

    প্রতিভাস

    কল-২ । ৬০০.০০

    যমুনা নদীর মুশায়রা

    সেলিনা হোসেন

    প্রতিভাস

    কল-২ । ৪০০.০০

    | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | | |

    সচেতন মনের অনুভূতি, অনুভবের নানা স্তর, মগ্নচৈতন্যের ওঠাপড়া বারেবারে ফিরে এসেছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে।

    তাঁর দুই বলিষ্ঠ হাতে জীবনসমুদ্রকে প্রবলভাবে মন্থন করেছেন তিনি। অমৃত ও গরল দুই-ই উঠে এসেছে এ মন্থনে। তবে অমৃতের ভাগই বোধহয় বেশি। জীবনের অজস্র অনুভব থরেথরে সাজানো রয়েছে তাঁর উপন্যাসে। আমাদের সচেতন মনের অনুভূতি, অনুভবের নানা স্তর, মগ্নচৈতন্যের ওঠাপড়া- কী নেই সেখানে! লেখিকার কলম কবিতার মতো তীব্র অনুভূতিময়। কিন্তু তা বাস্তব থেকে কখনও দূরে সরে যায়নি। অতি উচ্চশিক্ষিত, অভিজাত, উচ্চবিত্ত শহুরে মানুষ থেকে শুরু করে অতি নিম্নবিত্ত, অতি সাধারণ গ্রামের মানুষও উঠে এসেছে তাঁর উপন্যাসে। সমাজের সর্বত্র তাঁর অবাধ যাতায়াত। বিষয়বৈচিত্রেও তিনি অদ্বিতীয়। কখনও সুনামি (‘জলোচ্ছ্বাস’), কখনও মুক্তিযুদ্ধ (‘হাঙর নদী গ্রেনেড’), কখনও পৃথিবীবিখ্যাত কবি গালিব (‘যমুনা নদীর মুশায়রা’), কখনও- বা শহরের শিক্ষিতা তরুণী ও লেখকের গভীরে প্রেম (‘মগ্নচৈতন্যে শিস’), কখনও-বা ধর্ষিতা  হওয়া প্রতিবাদী এক নারীর কাহিনি এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের ছবি (‘দীপান্বিতা’), কখনও-বা মঙ্গলকাব্যের নবনির্মাণ (‘কালকেতু ও ফুল্লরা’), কখনও-বা এক স্বাধীনচেতা, ভাবুক মেয়ের কাহিনি (‘পদধ্বনি’)। ধর্মের অত্যাচার সম্পর্কে তাঁর কলম সরব। নারী নির্যাতনের নির্মম ছবি তিনি তুলে ধরেছেন বারেবারে।

    সেলিনা হোসেনের প্রথম উপন্যাস ‘জলোচ্ছ্বাস’ (১৯৭২)। জলোচ্ছ্বাসের মতোই তা আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। উপন্যাসের শুরুতেই লেখিকার কাব্যিক বর্ণনাভঙ্গি আমাদের চমত্‌কৃত করে, ‘দক্ষিণ বাংলা বঙ্গোপসাগরের কোলে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে বিশ্বাসে-অবিশ্বাসে-আদরে-সোহাগে-বঞ্চনায়-হতাশায়। বিলাসে অতৃপ্ত রমণীর মতো দক্ষিণ বাংলার মুখ-বয়স্ক রমণীর অভিজ্ঞতার মতো দক্ষিণ বাংলার হৃদয়-বেপরোয়া ধর্ষণে বিপর্যস্ত রমণীর মতো দক্ষিণ বাংলার শরীর।’

    মেঘনা, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা, রাবনাবাদ, বুড়ো গৌরাঙ্গ, কাজল নদীর কূলে কূলে আর বঙ্গোপসাগরের তীরে যারা বেড়ে ওঠে, সেই দক্ষিণ বাংলার মানুষগুলো, কেমন হয় তাদের মনের গঠন? ‘জীবন ওদের খেলার সাথি। মৃত্যু ওদের হাতের মুঠোয়।’ নদীর দিকে তাকিয়ে ওরা করে অন্নচিন্তা। প্রকৃতির রূপে স্বপ্নবিলাসী হওয়ার মতো মন তাদের কোনওদিন তৈরি হয় না। ‘সব হারানোর দেশে ওরা মূর্তিমান ক্ষুধা’। মনে আসে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের কথা।

    লেখিকা তুলে ধরেন মত্‌স্যজীবী পরিবারের জীবনসংগ্রামের ছবি। নারীর সামাজিক অবস্থানের ছবিও উঠে আসে। জালাল মাওলানার দ্বিতীয় পক্ষের সরল বউ তারাবানু। জালাল মাওলানার অত্যাচারে তার মৃত্যু হয়। জামাল শিকদার গোলাভরা ধান নিয়ে দ্বিতীয় বউ পুষতে চায়। জব্বর মিয়ার পরামর্শে সে বোবা বউ জোহরাকে ঘরে আনে। কারণ, দুই সতীনে ঝগড়া হবে না। পঞ্চাশ বছরের হাজি সাহেবের সঙ্গে সতেরো বছরের সাজেদার বিয়ে হয়। কারণ, তার তিন বউ তাকে এখন আর শয্যাসঙ্গিনী হিসাবে পুলকিত করতে পারে না। হাজি সাহেবের লালসা প্রকট হয়- ‘তোরে কাঁচা মরিচডার মতো চাবাইয়া খাইতে সাধ অয়।’

    আগুনমুখা একদিন জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়। শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটে। চারিদিকে লাশের স্তূপ। লেখিকা অনবদ্য ভঙ্গিতে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ছবি আঁকেন। এ উপন্যাসে তাঁর ক্যানভাস মস্ত বড়। অজস্র চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছেন তিনি। প্রতিটি চরিত্রই বাস্তব এবং জীবন্ত। উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে আশাবাদে। সুনামির পরেও সর্বস্বান্ত মানুষ নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। হোগলা হিন্তাল খেজুরের পাতার কুটিরে রাঙাবালি গ্রাম আবার নতুন করে সেজে ওঠে।

    ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬) সেলিনার একটি অসাধারণ উপন্যাস। হলদিগাঁয়ের খুব সাধারণ এক মেয়ে বুড়ি। সে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তার উপলব্ধি, তার অনুভূতিগুলিকে লেখিকা অপূর্ব ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। বুড়ির বিয়ে হয় গফুরের সঙ্গে। গফুরের আগের পক্ষের দুই সন্তান সলিম ও কলিমকে বুড়ি আপন করে বুকে টেনে নেয়। বুড়ি চঞ্চলা কিশোরী থেকে ধীরে ধীরে পরিণতমনস্ক গৃহিণীতে পরিণত হয়। নিজের একটি সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় সে আকুল হয়। বহু প্রতীক্ষা ও সাধ্যসাধনার পর যে-সন্তানের জন্ম হয়, সে বোবা ও কালা। সেই রইস-কে আঁকড়ে থাকে বুড়ি। গফুরের মৃত্যু হয়। সলিম, কলিম যুবক হয়। সলিমের বউ রমিজা ঘরে আসে। সলিম, কলিম মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। সলিম ও কলিমের সংস্পর্শে খুব সাধারণ নারী বুড়িও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। সে আড়াল থেকে সলিম কলিমের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনা শোনে। গভীরভাবে প্রাণিত হয়। বুড়ি মুজিবুর রহমানকে দেখতে চায়। হলদিগাঁয়ের জন্য কিছু করতে চায়। ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি তার মনে আলোড়ন তোলে। সলিম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার জন্য রওনা হয়। বুড়ির চোখের সামনে থেকে মিলিটারিরা কলিমকে ধরে নিয়ে যায়। প্রতিশোধস্পৃহা জ্বলে ওঠে বুড়ির, ‘ওর ইচ্ছে করছে আগুন জ্বালাতে। বাঁশপাতা আমপাতা বুকে নিয়ে চুলোটা যদি এখন জ্বলে ওঠে বেশ হয়। ওরা দেখুক সবাই পালায় না, কেউ কেউ আগুন জ্বালায়।’ বুড়ির চোখে অত্যাচারিত কলিম পরিবর্তিত হয় হলদিগাঁয়ে। বুড়ির সামনেই মিলিটারি কলিমকে হত্যা করে। বুড়ি তার গ্রামের দুই মুক্তিযোদ্ধাকে নিজের বাড়ির ধানের মটকার মধ্যে লুকিয়ে রাখে। মিলিটারি তাদের সন্ধানে এলে বুড়ি রইসের হাতে রাইফেল দিয়ে তাকে এগিয়ে দেয়। মিলিটারি মুক্তিযোদ্ধা ভেবে রইসকেও হত্যা করে, রইসের প্রাণের বিনিময়ে সে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণ বাঁচায়। সে আর শুধুমাত্র রইসের মা থাকে না, তার উত্তরণ ঘটে। অজস্র মুক্তিযোদ্ধার মায়ের আসন সে দখল করে। বুড়ির দেশমাতৃকার সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত হবার ছবি বেশ বিশ্বস্তভাবে এঁকেছেন সেলিনা।

    ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’ (১৯৭৯) ও ‘পদশব্দ’ (১৯৮২) দু’টি উপন্যাসেই দু’জন স্বাধীনচেতা, গভীর মনের নারীর দেখা পাই। দু’জনেই তাদের বাবার প্রতি ক্ষুব্ধ। ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সংবেদনশীল লেখক জামেরি। এই উপন্যাস জামেরি ও মিতুলের গভীর প্রেমের কাহিনি। হাসপাতালে মিতুলের কৃত্রিম শ্বাস চলতে থাকলে তার বাবা শ্বাস প্রত্যাহারের দাবিতে মেডিক্যাল বোর্ডে আবেদন জানান। কারণ, তাঁর মতে এটি ধর্মবিরোধী কাজ। মেয়ের প্রাণের চেয়ে তাঁর কাছে ধর্ম বড়। জামেরি এর তীব্র প্রতিবাদ করে। লেখিকা জামেরির মাধ্যমে মুসলিম ধর্মের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জামেরির মাধ্যমে সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের মগ্নচৈতন্যকে লেখিকা শিস দিয়ে জাগাতে চেয়েছেন।

    ‘পদশব্দ’ উপন্যাসের নায়িকা সালমা এক স্বাধীনচেতা, ভাবুক মেয়ে। সে আর সকলের চেয়ে আলাদা। বাবাকে সে ঘৃণা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দাম্ভিক পিতা পুরস্কার পেলে সে খুশি হয় না। তার চোখে বাবা জাহির চৌধুরী ফাঁকির পাহাড়, লোভের রক্তপিণ্ড। বাবার প্রভুত্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে সে রাজি নয়। সে চেয়েছিল একজন মহত্‌ পিতা। তাই সে বাবার চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে না। তার ভালবাসার মানুষ রকিবকে সে বিয়ে করে। বাবা, মা, ভাইয়ের অধিকারবোধের ব্যাপারটিকে সে মানতে পারে না। সালমার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, তার প্রতিবাদী সত্তা লেখিকার কলমের জোরে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

    ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ (১৯৮৩) উপন্যাসে মঙ্গলকাব্যের অবিনির্মাণ ঘটেছে। এটি একটি প্রতীকী উপন্যাস। চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের কালকেতু ও ফুল্লরার রূপকে বিশ শতকের বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্রী এক রাষ্ট্রনায়কের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। লেখিকা কখনও আমাদের নিয়ে গেছেন বিশ শতকের বাংলাদেশে। আবার পরের মুহূর্তেই নিয়ে গেছেন মঙ্গলকাব্যের যুগে। যখন ফুল্লরা মাংস ফেরি করছে, কালকেতু ব্যাধরূপে জঙ্গলে পশু শিকার করছে। দেবী চণ্ডী ষোড়শী সুন্দরীর বেশ ধরে কালকেতুর ঘরে বসে আছেন। ফুল্লরা তাকে দেখে শঙ্কিত হচ্ছে। দেবী কালকেতুকে ঘড়া ঘড়া মোহর দিচ্ছেন। এর পরই আবার লেখিকা আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন বিশ শতকের বাংলাদেশে। মেঘনা নদী, ঢাকা শহর, গুলশান মার্কেটের উল্লেখ পাচ্ছি। ‘বাংলাদেশ’ নামটি কোথাও নেই। আছে ‘কলিঙ্গ’ নগরের উল্লেখ।

    ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’ উপন্যাসে ভাঁড়ু দত্ত ও ফুল্লরা ড্রাগসের ব্যবসা করে। কালকেতু গল্ফ খেলে, সে অত্যন্ত ফিগার সচেতন, স্বল্পাহারী, কাঁটা চামচ দিয়ে খায়, বিদেশি সিগারেট ধরায়। কালকেতু অত্যন্ত অত্যাচারী শাসক। সে দেশের সমস্ত মানুষের কণ্ঠরোধ করে রেখেছে। তার কাজের সামান্যতম সমালোচনা যে করে, তাকে সে হত্যা করে। দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে বিদেশিদের দেওয়া রিলিফের টাকা সে আত্মসাত্‌ করে। সেই টাকা সে বিদেশের ব্যাঙ্কে রাখে। ব্যবসার নানা কৌশলের মাধ্যমেও সে অর্থ আত্মসাত্‌ করে। সে কলিঙ্গ নগরীর রাজা। কলিঙ্গের রূপকে লেখক বাংলাদেশের কথা বলেছেন। কালকেতু ও ফুল্লরা নগরের মাঝখানে নিজেদের দু’টি সোনার মূর্তি স্থাপন করে। নগরের বিক্ষুব্ধ মানুষ সেই মূর্তি দু’টি ভেঙে দেয়। গণঅভ্যুত্থান ঘটে। গণআদালতে কালকেতু ও ফুল্লরার বিচার হয়। জনগণ তাদের ফাঁসি দেয়।

    এই উপন্যাসে লেখিকা কখনও স্পষ্টভাবে সময়ের উল্লেখ করেননি। কিন্তু নারী দশকের শুরুতে ফুল্লরা বক্তৃতা দিচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায়, ১৯৭৬ সনের কথা বলা হয়েছে। কারণ, নারী দশক ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫। বিশ শতকের পণ্যনির্ভর পৃথিবীর ছবি ফুটে ওঠে। ‘তৃতীয় বিশ্ব’, ‘উন্নয়নশীল দেশ’, ‘সামরিক অভ্যুত্থান’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দেখি।

    দীপান্বিতা (১৯৯৭) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। ‘দীপান্বিতা’-কে নারীজাগরণের উপন্যাস বলা যেতে পারে। তেইশ বছরের যুবতী সুনীতি একটি এনজিও-তে কাজ করত। ঋণ বিতরণের কাজ। গণ্ডগ্রামে তার অফিস। একদিন সে সহকর্মী মিহিরের দ্বারা তিলগুনিয়া গ্রামে ধর্ষিতা হয়। মিহিরের পর তাকে ধর্ষণ করে তোরাব নামক ইঞ্জিন-নৌকার চালক। তোরাব নিজের কীর্তি গোপন রেখে মাওলানার দলে যোগ দেয়। গ্রামে মাওলানা রায় দেন, ধর্ষণের ঘটনায় গ্রাম ‘না পাক’ অর্থাত্‌ অপবিত্র হয়ে গেছে। এর প্রতিকার হবে সুনীতির সঙ্গে ধর্ষণকারী মিহিরের বিয়ে দিলে। সমস্ত দোষ সুনীতির। কেন সে সন্ধ্যার সময় পুরুষের সঙ্গে পথে বেরিয়ে তার যৌন ক্ষুধা জাগিয়েছে! সুনীতি ও মিহিরের বিয়ে দেওয়া হয়। এরপর সুযোগমতো সুনীতি চটি ছুড়ে মেরে মিহিরের একটি চোখ অন্ধ করে দেয়। সুনীতি ধর্ষণের ব্যাপারটিকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ায়। কোনও মতেই সে হার মানবে না। সুনীতির প্রেমিক সৌরভ তাকে প্রত্যাখ্যান করে। চন্দ্রভানুর সহায়তায় সুনীতির গর্ভস্থ সন্তান আলোর মুখ দেখে।

    এ উপন্যাসে গ্রামাঞ্চলে মাওলানার ভয়াবহ অত্যাচারের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। মাওলানার বিধান- স্বামী মারা গেলেও কোনও মেয়ে হাসপাতালে যেতে পারবে না, কোনও মেয়ে ব্যবসার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিলে স্বামী তাকে তালাক দেবে। যক্ষ্মা রোগ হলেও কোনও নারী ডাক্তারের ওষুধ খেতে পারবে না। তাহলে সে খ্রিস্টান হয়ে যাবে। অবৈধ প্রেম করলে মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হবে। ধর্ষণ নিয়ে আজ পর্যন্ত অনেক উপন্যাস লেখা হয়েছে। কিন্তু ‘দীপান্বিতা’ ধর্ষিতা নারীর সমাজকে উপেক্ষা করে আলোকস্তম্ভের মতো মাথা তুলে দাঁড়াবার কাহিনি। এ উপন্যাসে লেখিকা আঙ্গিকের দিকেও নতুনত্ব এনেছেন। কখনও সুনীতির চিন্তাভাবনাগুলিকে ক,খ,গ,ঘ- এভাবে সিদ্ধান্তের আকারে লেখা হয়েছে। কখনও বা লেখিকার ভাবনাগুলিকে ঙ,চ,ছ,জ- এভাবে সূত্রাকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

     

    ‘যমুনা নদীর মুশায়রা’ উপন্যাসে বিখ্যাত কবি মির্জা গালিবের সমগ্র জীবন বর্ণিত হয়েছে। লেখিকার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই উপন্যাস। লেখিকা বিবিধ গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছেন। ভ্রমণ করেছেন চাঁদনি চক, জামা মসজিদ, লালকেল্লা। দর্শন করেছেন গালিবের সমাধিস্থল, সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিস্থল, কাশ্মীরি গেট। এ উপন্যাসে লেখিকা শুধু গালিবের ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলেননি। সমসাময়িক ভারতবর্ষের ইতিহাসও তুলে ধরেছেন। সিপাহি বিদ্রোহের সময় গালিবের বয়স ছিল প্রায় ষাট বছর। গালিবের চোখ দিয়ে লেখিকা সিপাহি বিদ্রোহের ছবি দেখিয়েছেন। ইতিহাস ও সাহিত্যের এ এক অপূর্ব মেলবন্ধন। লেখিকা ইতিহাস অন্বেষণ করে দেখিয়েছেন, কেন গালিব সিপাহি বিদ্রোহের সময় ইংরেজদের সমর্থন করেছিলেন। গালিবকে বড় সুন্দর করে গড়েছেন তিনি। একজন কবি যে আর পাঁচজন মানুষের চেয়ে আলাদা, উপন্যাসটি পড়লে আমরা তা অনায়াসে বুঝতে পারি। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে এক-একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেয় গালিবের এক-একটি শের।

    ‘ছুটে চলেছে জীবনের ঘোড়া,/ কে জানে কোথায় থামবে/ না আছে হাতে লাগাম,/ না পা আছে রেকাবে’, নিজের রচিত এই শেরটির মতোই এক মানুষ গালিব। নিজের লাগাম তাঁর নিজের হাতে নেই। তিনি আকণ্ঠ সুরা পান করে বুঁদ হয়ে থাকতে ভালবাসেন। ভালবাসেন ভাল খাবার খেতে, শৌখিন ও দামি পোশাক পরতে। বেহিসাবি, লাগামছাড়া তাঁর জীবন। সুন্দরী তোয়াইফের আঁখির মদিরা পান করে কাটিয়ে দেন রাতের পর রাত। পত্নী উমরাও-এর ভাষায় ‘গালিব তাঁর দিনগুলো আকাশের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সেগুলো কোথায় গিয়ে পড়ল তার খোঁজ রাখল না।’ বিয়ের পরেই পত্নীকে তাঁর মনে হয়েছে পায়ের বেড়ি, দিল্লি শহরকে মনে হয়েছে কারাগার। তাঁর বাপ-দাদা তরবারি ধরতেন, তিনি ধরেছেন কলম। বাবা তাঁকে ঘোড়ার বাচ্চা উপহার দিতে চাইলে, তিনি চাইতেন পাখির বাচ্চা। আবাল্য যমুনা নদীর সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য। ঘুড়ি নিয়ে জীবনের প্রথম কবিতা লিখলেন। জীবনে দুঃখও পেয়েছেন অনেক। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। তাঁর সাতটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। সাতজনই জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যে মারা গেছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে ভালবাসতেন গালিব। অভাবে, দারিদ্রে শেষ পর্যন্ত সেই ঘোড়াটিকেও বেচে দিতে হয়েছে।  ভাতার সামান্য কয়েকটি টাকার জন্য এক রাজ্য থেকে আর-এক রাজ্যে পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। সিপাহি বিদ্রোহের সময় শুধু শুকনো রুটি খেয়েও থেকেছেন। মিঠা পানির অভাবে নোনা পানি খেয়েছেন। জীবন মন্থন করে যা পেয়েছেন, তা উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর গজ়লে।

    এ উপন্যাসের ‘ভূমিকা’ অংশে মুদ্রণের ক্ষেত্রে একটি ভুল হয়েছে। গালিবের জন্মসাল ১৭৯৭ সনের ২৭ ডিসেম্বর। ছাপা হয়েছে ‘১৮৯৭’। ভূমিকায় লেখিকা লিখেছেন, ‘উপন্যাসের শেষে যেসব গ্রন্থের উল্লেখ করেছি....।’ কিন্তু উপন্যাসের শেষে কোনও গ্রন্থেরই উল্লেখ নেই। বইটি এত সুন্দর ছবি দিয়ে অলংকৃত হয়েছে, অথচ মুদ্রণের ক্ষেত্রে এই অমনোযোগ কেন?

    সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে সমাজের অন্যায়ের প্রতিবাদে, আশাবাদে। তাই তাঁর উপন্যাসের শেষে নির্যাতিতা নারী নতুনভাবে বাঁচতে চায়। রোগ, ব্যাধি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কোনও কিছুর কাছেই মানুষ মাথা নোয়ায় না।