শিল্পসংস্কৃতি

চিত্রকলা

অরুণ ঘোষ

  • পূর্ব ও পশ্চিমের কথোপকথন

    কোনও কৃত্রিম বিভাজন আজও রেখাপাত করেনি দুই বঙ্গের জলরং প্রীতিতে। আলোচ্য প্রদর্শনীটিতে তার প্রমাণ মিলল।

    ‘প্রাচী-প্রতিচী’ নামের এক সংস্থা কয়েক বছর নানা শিল্পকর্মকাণ্ড সংঘটিত করছেন দেশে-বিদেশে। এঁরা আগে অন্য নামেও পরিচিত হতেন। ইদানীং এদের তিনটি সংস্থা এক ছাতার নিচে এসেছেন। এঁদের কাছে ‘প্রতিচী’ শব্দটি (কোনও দুর্বোধ্য কারণে এদের নামের বানানে ‘প্রতীচী’কে এই রূপে দেখতে পাচ্ছি) অবশ্য ‘পশ্চিম’-এর গন্ডিতে আবদ্ধ নয়, তা আসলে স্বদেশের বাইরের কথা মনে পড়ায়। আপাতত তা বাংলাদেশ বা তাইল্যান্ডে বিস্তৃত হয়েছে, ক্রমশ আরও বাড়বে অবশ্যই।

    সম্প্রতি প্রকাশিত এক পুস্তিকায় এদের আগামী কর্মকাণ্ডের যে-রূপরেখা পাওয়া গেল তার অন্যতম হল কলকাতায় স্থায়ী আর্ট গ্যালারি খোলা ও সেইসঙ্গে বাংলায় শিল্পকলা-বিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশ। কলা-বিপণনের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক এই দুই হাতিয়ার যে অবশ্যই হাতে থাকা প্রয়োজন তা এঁরা ঠিকই বুঝে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক অতীতের নিরিখে এঁদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা না করে উপায় নেই। ইতিমধ্যেই একাধিক আর্ট ক্যাম্পের মাধ্যমে বেশ কিছু কলা-নিদর্শন এঁদের সংগ্রহে এসেও গিয়েছে। মূলত সেই সংগ্রহ থেকেই আয়োজিত এক বড়সড় চিত্র-ভাস্কর্য প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে প্রথমেই যে কথাটা মনে এল তা হল, সংগৃহীত শিল্পকলার সংখ্যাধিক্যে এঁরা যে-মাত্রায় উত্‌সাহিত, তার গুণমান বজায় রাখা সম্পর্কে এঁরা ততটাই উদাসীন। বড় মাপের বহুদর্শিত শিল্পীর পাশে অপেক্ষাকৃত অনালোচিত বা নবীন শিল্পীর ছবির উপস্থিতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু উভয়ের শিল্পমানে গুণের মাত্রাতিরিক্ত তফাত থাকলে তা মনে আনে বিরক্তি, ঘটায় দৃষ্টিশূল। এই প্রদর্শনী তার উত্‌কৃষ্ট উদাহরণ।

    অথচ অত্যুন্নত শিল্পকর্ম এঁদের সংগ্রহে ছিল যথেষ্ট সংখ্যায়। আসলে, দুধ থেকে জল ছেঁকে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। শিল্পীদের সংখ্যা চৌষট্টি। আর ছবি বা ভাস্কর্য সম্ভবত- গুনে দেখিনি, দেড়শোর কাছাকাছি। প্রদর্শনীর দু’টি কক্ষের প্রাপ্ত পরিসরে ছবির ছড়াছড়ি। তারই মধ্যে খুঁজে নেওয়া গেল কাইয়ুম চৌধুরীর গুটি পাঁচ রেখাচিত্র। ইন্দ্র দুগারেরও সমসংখ্যক ছবি, গণেশ হালুই, যতীন দাস, হাশেম খান, থোটা বৈকুণ্ঠম, সুনীল দাস, মনোজ দত্ত বা মানু পারেখের রেখাচিত্র। যোগেন চৌধুরীর একটি ছাপাই ছবিতে রেখার উত্তম ব্যবহারও এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। এ বঙ্গে যামিনী রায়, বাংলাদেশে জয়নাল আবেদিন সাহেবের তুলিতে ভর করে যে রেখাপ্রয়োগের বিবর্তন দুই বাংলার ছবির মননকে এক সূত্রে বেঁধেছে, তা যেন ধরা পড়ে যায় কাইয়ুম চৌধুরী থেকে যোগেন চৌধুরী, হাশেম খান থেকে মানু পারেখের ছবিতে। পরিতোষ সেনের আত্মপ্রতিকৃতিটিও তাঁর রেখা প্রয়োগের অনন্যতা স্মরণ করায়। এগুলি সেভাবে সাজালে প্রদর্শনীর মান বেড়ে যেত নিঃসন্দেহে।

    কোনও কৃত্রিম বিভাজন আজও রেখাপাত করেনি দুই বঙ্গের জলরং প্রীতিতে। এই ঘরানায় গোপাল ঘোষ বা মুস্তাফা মানোয়ারের অনুপস্থিতি ভুলিয়ে দেয় বাংলাদেশের বর্ষীয়ান শিল্পী অলোকেশ ঘোষের ‘বায়স-সম্মিলনী’। হলুদ নরম মাঠে উদগ্রীব এক দল কাক। পাখিসুলভ চঞ্চলতার সার্থক প্রতিরূপ এসেছে তুলির দ্রুত টানে, কালো রঙের বিভিন্ন মাত্রা একত্রে প্রয়োগের সৃষ্টি কুশলতায়। বাংলাদেশের আর এক প্রবীণ শিল্পী, মহম্মদ মুনিরুজ্জামানের ছবিটিও এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। বর্ষায় জলধর মেঘের শোভার এক অদ্ভুত ক্লোজ-আপই যেন রয়েছে তাঁর বিমূর্ত প্রকৃতি আবাহনের মূলে।

    তেলরং বা অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবির সংখ্যাই অবশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তার মধ্যেই, বিষয় নির্বাচনের অন্যতর গুরুত্বে, নজরে আসে বাংলাদেশের আর এক প্রবীণ শিল্পী রফিকুন নবীর ছবি, গত বছরেই আঁকা। ছবির কেন্দ্রে প্রায় বিষণ্ণ নয়নেও অবিচল এক পক্ষীমাতা, তার পক্ষপুটে আশ্রয় পেয়েছে চার-চারটি কৌতূহলী পক্ষীশাবক। নীচে, পাশে জল, ওপরে হলুদ আকাশে মার্তণ্ড প্রতাপ। মিতব্যয়ী রেখায় সৃষ্ট জ্যামিতিক অবয়বে ভারি সুন্দর গড়েছেন বিপন্ন পাখির প্রতীকে বর্তমানের পরিবেশদূষণ জনিত সতর্কতার আবেদন। কলকাতার সুব্রত চৌধুরী এক বড়সড় ক্যানভাসে এঁকেছেন যুযুধান দুই দুর্গাদেবী। দু’জনেই সমরূপা রক্তাম্বরা ও দশভুজা। নিরাভরণ দেবীদেহের শিরোভূষণও আড়ম্বরহীন। শিল্পী সম্ভবত সচেতনভাবেই বর্জন করেছেন তৃতীয় নয়নের উপস্থিতি এবং সেই সূত্রে দেবীর আননে এসেছেন বঙ্গনারীর স্পষ্ট পরিচিতি। তাঁরা যে কেন রণ-মগ্ন তা অবশ্য দর্শকের কল্পনাবিস্তারেই কেবল পূর্ণতা পায়।

    সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, পার্থ ভট্টাচার্য, শেখর কর, অশোক মল্লিক, জহর দাশগুপ্ত, শেখ আফজল বা জামাল আহমেদ প্রমুখ শিল্পীরা ফিগারেটিভ ঘরানায় স্বীয় মুনশিয়ানা অব্যাহত রেখেছেন। আধা-বিমূর্ত ঘরানায় আস্থা বজায় রেখেছেন বাংলাদেশের সাহাবুদ্দিন, দুলাল গায়েন, রঞ্জিত দাস, এ বঙ্গের তরুণ দাস, প্রদীপ দাস বা আশীষ রেহমান।

    এই প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যের সংখ্যাও ছিল যথেষ্টই এবং তার মধ্যে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি সম্ভবত ব্যয়সঙ্কোচের প্রয়োজনেই। অসীম বাসু কর্মজীবনে শিল্পের বাণিজ্যিক বিভাগেই বিশেষ দক্ষ ছিলেন। গত এক দশকে তিনি ভাস্কর্যে মনোনিবেশ করেছেন এবং এক স্বতন্ত্র ভঙ্গী আয়ত্ত করেছেন স্ব-জাত কুশলতায়। ওঁর বিষয়ভাবনার কেন্দ্রে সর্বদাই ঘোরাফেরা করে সাধারণ জনজীবনের নিবিড় মুহূর্ত। ওঁর কাজ যেন ব্রোঞ্জ-নির্মিত ফোটোগ্রাফ। তারই মধ্যে গঠনের চাতুর্য ও অবয়বের সূক্ষ্ম রেখায় ফোটে মননের দীপ্তি। এই প্রদর্শনীতে ছিল বৃদ্ধ পিতামহের আদরে শিশুর সুখগান। পৌত্রের আগ্রহে বৃদ্ধের আনত মুখের আদলটুকুই রেখেছেন শিল্পী, অবয়বের রিয়ালিজম বর্জন করে সৃষ্টি করেছেন দাদু ও নাতির প্রেমবন্ধন। ধাতুর কাঠিন্য যেন তরল হয়ে যায় গঠনের ‘অসীম’ দক্ষতায়।

    ভবতোষ সুতার, তাপস বিশ্বাস, সুব্রত পাল, প্রভাত মাঝি, কিঙ্কর সাহা, রামকুমার মান্না, অনিল সেন, সোমনাথ চক্রবর্তী, বিমল কুণ্ডু, মানিক তালুকদার, বিপিন গোস্বামী, শঙ্কর ঘোষ ও নিরঞ্জন প্রধান- এঁদের সবার কাজই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের, বিশেষত অপেক্ষাকৃত তরুণ ভাস্করদের কাজে ছিল সোমনাথ হোড় ও মীরা মুখার্জির প্রেরণা। এঁদের মধ্যেও আলাদা করে খুঁজে নেওয়া যায় সন্দীপ চক্রবর্তীর রামকৃষ্ণ-অবয়ব। মিনিম্যালি জমের আদলে এসেছে ধ্যানমগ্ন রূপ। ‘ডানা মেলে দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের’ গঠন ভারি সুন্দর এসেছে অখিল দাসের ধাতুনিবদ্ধ রূপকল্পে। আর মৃণাল গায়েন অবিচল থেকেছেন রিয়ালিজমের নিখুঁত আদলে বিমূর্ত ছন্দোময়তার সৃষ্টিতে। পুষ্করিণীর ধার ঘেঁষা গাছগাছালি হাঁস-পাখির ভিড় ও জলে তার ছায়া- এই হল মৃণালের সাম্প্রতিক ভাস্কর্য চিন্তার মূল। ইদানীং তার সাফল্য মৃণালের কাজে সুস্পষ্ট।

    আগেই বলেছি এই প্রদর্শনী প্রকৃত অর্থেই ছিল ভালমন্দের স্বেচ্ছালব্ধ মিশেল। এরই মধ্যে, প্রদর্শনীর দ্বারপ্রান্তে, চোখে আসে গণেশ পাইনের দু’টি ছবি। একটি রেখাচিত্র, অন্যটি টেম্পেরা। বিষয় ভাবনায় অতি পরিচিত, তথাপি যেন অজানা অচেনা মনে হয়। এই ছবির উত্‌স সম্বন্ধে কৌতূহল তাই থেকেই

    যায়। সন্দেহও দানা বাঁধে মনে, হয়তো অকারণে।