শেষকথা

ভরতুকিতন্ত্র আর কতদিন?

হর্ষ দত্ত

  • সমাজতান্ত্রিক ধাঁচায় অভ্যস্ত এদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরতুকিতন্ত্র বাসা বেঁধেছে।

    আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো লোকসভা বা বিধানসভার নির্বাচনের আগে যে-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিতে থাকে, সেগুলো শুধু রংবেরঙের নয়, মনপ্রাণ আপ্লুত করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কোনও দল যদি ঘোষণা করে ভোটে জিতলে জনগণকে দু’টাকা কিলো দরে চাল দেব, তবে অন্য দল ঘোষণা করে- গরিব আদমির জন্যে রোটি-কাপড়া আউর মোকান মুফ্ত। স্পষ্টতই জনগণ এই সব স্বপ্নাতীত প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত হয়, ক্রমাগত প্রচারে মানুষের প্রত্যাশা বাড়তে থাকে, প্রতিশ্রুতিগুলোকে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে। ভোটদাতারা যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে না যে, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হওয়া আদৌ সম্ভব কি না! বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নির্বাচনে জিতে এসে সরকার তার প্রতিশ্রুতি রাখেনি। অবাস্তব প্রতিশ্রুতি অচিরেই উধাও হয়ে গেছে। আর যেখানে কোনও প্রতিশ্রুতির রূপায়ণ ঘটে, যেখানে স্পষ্টতই তা হয় ভরতুকির ওপর ভর করে। আরও স্পষ্টভাবে বললে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতির তালিকা তৈরি করে ওই ভরতুকির দিকে লক্ষ রেখেই। সমাজতান্ত্রিক ধাঁচায় অভ্যস্ত এদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরতুকিতন্ত্র বাসা বেঁধেছে। জীবনযাপনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভরতুকি পেতে আমরা শুধু অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি তা-ই নয়, ভরতুকি পাওয়াটাকে মানুষ এখন এক গণতান্ত্রিক অধিকার বলে ভাবে। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির দিল্লিবাসীকে প্রতিদিন সাতশো লিটার জল ফ্রি দেওয়া কিংবা চারশো ইউনিট বিদ্যুত্‌ ব্যবহারের জন্য অর্ধেক মূল্য নেওয়ার আয়োজন আদতে সেই ভরতুকিতন্ত্রেরই পুনঃপ্রতিষ্ঠা! দিল্লির মতো শুষ্ক জায়গায় ‘ওয়াটার অ্যাজ আ রাইট’ ভাবনা খুবই জুতসই সন্দেহ নেই। অরবিন্দ কেজরীবাল জল নিয়ে জনগণের সেই আবেগের জায়গাটাকে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। অথচ দিল্লির মানুষ প্রশ্ন তোলেনি, পরিশুদ্ধ জল কি আকাশ থেকে পড়বে? বিদ্যুত্‌ উত্‌পাদন করতে কি কোনও খরচ হবে না? এসব কাজে যদি এক টাকাও ব্যয় হয়, তবে পঞ্চাশ পয়সায় জনগণকে কীভাবে তা দেওয়া হচ্ছে? কার পকেট থেকে আসছে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ?

     এসব প্রশ্নের কোনও যুক্তিসঙ্গত উত্তর রাজনৈতিক দলগুলো কখনওই দেয় না। তারা গদি দখল করার জন্যে বরং ভরতুকি দেওয়ার, ভরতুকি পাওয়ার ধারাটিকে বাঁচিয়ে রাখে। তাতে কাজও হয়। দল হইহই করে জেতে, যুক্তিতর্ক, বাস্তব-অবাস্তব সেই জয়ের স্রোতে অনেক দূর ভেসে যায়। এদিকে ভরতুকিতে আসক্ত ও পরিপুষ্ট জনগণ ভেবেও দেখে না, এই টাকা সরকার তার কাছ থেকেই নানা কর বাবদ আদায় করেছে। করের টাকায় দেশের উন্নয়ন সাধিত হয়, কর গ্রহণের লক্ষ্যই দেশহিতে সেই টাকার সুষ্ঠু বণ্টন ও ব্যয়। কিন্তু তার বদলে করদাতাদেরই পরিতোষণে ‘ভরতুকি’ নাম দিয়ে সেই টাকা খরচা করার এই খেলার কাছে এ দেশের মানুষ পরাভূত। এই খেলা অচিরে বন্ধ হওয়া দরকার। ব্যয়ের অর্ধেক টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ভরতুকি হিসেবে নিয়ে, দেশকে ক্রমশ দেউলিয়ার পথে ঠেলে দেওয়ার মতো জনমোহিনী রাজনীতি করার মানে কী? এই ট্র্যাজেডি থেকে কবে আমাদের মুক্তি ঘটবে!

     

    অঙ্কন: শুভম দে সরকার