মন্তব্য

রাজনীতি

সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়

  • একটি শহর ও এক কমন ম্যান

    চিরকালই অন্য শহরের চেয়ে দিল্লি বেশি সুযোগ পেয়েছে।

    মাস মার্কেটে অরবিন্দ কেজরীবালের ইমেজটি হল এক প্রবল দুর্নীতি-বিরোধী মানুষের। আশপাশের দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজব্যবস্থার চরম বাস্তব নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা। এতটাই যে, তিনি বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজেন একেবারে বাস্তবোত্তর স্তরে, প্রতীকী সম্মার্জ্জনীতে। ই-যুগে তাঁর প্রায় প্রতি পদক্ষেপ, কার্যক্রম ‘হিট’। রাতারাতি খ্যাতিমান হয়ে, অনেকটা হিন্দি ছবির কায়দায়, বছরখানেক আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীপদে নির্বাচিত হয়েছিলেন কেজরীবাল। সেবার পদে থাকলেন মাত্র ৪৯ দিন। তারপর সকলকে বিস্মিত করে হঠাত্‌ই ছেড়ে দিলেন। কারণ, অন্য দলগুলির মদত না থাকায় দুর্নীতি-রোধক আইন পাশ করাতে ব্যর্থ হয় তাঁর ‘সংখ্যালঘু’ সরকার। পদত্যাগ করে পরে আবার ক্ষমা চাওয়ার ক্যাম্পেনও করলেন দিল্লিবাসীর সামনে, তাঁর হঠকারিতার জন্য।

    যে-বৈদ্যুতিন মাধ্যম তাঁকে খ্যাতিমান করে তুলেছিল, সেই বৈদ্যুতিন মাধ্যমেই তাঁর ‘সততা’ গ্রাফিক হয়ে উঠল এরপর। ছবিসহ দেখা গেল ‘কেজরীবাল ইজ় সো অনেস্ট’ শীষর্ক ‘মিম’(meme)-গুলি। তার মধ্যে একটি ছিল, ‘কেজরীবাল ইজ় সো অনেস্ট দ্যাট হি স্পেল্স অনেস্ট উইথ দ্য এইচ!’ আপাত-হাস্যকর এই মিমটি নিয়ে ভাবনাচিন্তার অবকাশ আছে কিঞ্চিত্‌। বিশেষত, কেজরীবালের সাম্প্রতিক ‘ঐতিহাসিক’ জয়ের পর। যে-মানুষটি ঘোষিত দুর্নীতি-বিরোধী, সততাই যার মূল সহায়, তাঁরই সততা কেন হাসির খোরাক? আবার তিনিই বা কেন ফের বিপুল ভোটে জয়ী মাত্র এক বছরের ব্যবধানে?

    মোদী নামক ব্যক্তিত্বের ছায়া যে-সময়ে চারদিক ঘিরে ফেলেছে, ঠিক সেই সময়েই মোদীরই ক্ষমতাবলয়ে- খোদ দিল্লিতে - কংগ্রেসকে নিশ্চিহ্ন করে, বিজেপিকে প্রান্তে ঠেলে দিয়ে আপ-এর পুনরুত্থান। এর নেপথ্যে অবশ্যই ‘মাফলারম্যান’ কেজরী। মোদীর ইমেজও একজন সত্‌, উদ্যোগী, দেশপ্রেমিক মানুষের ইমেজ। উপরন্তু, তিনি একদা-বিবাহিত, অধুনা কৌমার্যব্রতধারী। যথাসম্ভব অসাম্প্রদায়িকও। তা হলে কয়েক মাসের মধ্যে এঁদের দু’জনের জনপ্রিয়তায় তফাত হল কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণের আগে একটি কথা স্মরণে রাখা প্রয়োজন- মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর ক্যাবিনেট মিনিস্ট্রি থাকলেও দিল্লি কিন্তু প্রথাগত রাজ্য নয়। ইউনিয়ন টেরিটরি। সংবিধানের ৬৯তম সংশোধনী দিল্লিকে রাজ্যের মর্যাদা দিলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ব্যতিক্রম রেখে দিয়েছে। যেমন, জমি, আইন ও প্রশাসন, পুলিশ। এই ক’টি ক্ষেত্রে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের সঙ্গেই চলতে হবে দিল্লিকে। সুতরাং কেজরী-মোদী সম্পর্ক কিন্তু কোনও নৈতিক সংঘাতের উপর ভর করে থাকতে পারবে না। বিজেপি এ বিষয়টি বোঝে, বোঝেন কেজরীবালও। তাঁদের দু’জনের জনপ্রিয়তার রকম তাই ভিন্ন। তফাতটি শুধু হল, কেজরীবাল বাস্তব নিয়ে নাড়াচাড়া করলেও তাঁর মূল যে-বক্তব্য, সেটি কতটা বাস্তবসম্মত রূপ পাবে তা এক ভাববার কথা।

    কেজরীবালের মধ্যে সমসময়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত দিল্লিবাসী খুঁজে পেয়েছেন এক রোমান্টিক ত্রাতাকে, যিনি ভরতুকি দিয়ে বিদ্যুতের বিল, জলের কর লাঘব করে দেবেন। তিনি ‘আম আদমি’, সাধারণ মানুষ। তিনি জেড ক্যাটেগরির নিরাপত্তা নিতে অস্বীকার করেন। আপামর মানুষের অভাব-অভিযোগের কথা শুনতে যিনি বাদশা আকবর স্টাইলে ‘দরবার’-এর ব্যবস্থা করেছেন।

    মোদী অতশত কিছুই করেননি। মোদী হলেন যাকে বলে প্র্যাগম্যাটিস্ট। ঘোর বাস্তবমুখী। তিনি বোঝেন, কেজরীর যা-যা প্রতিশ্রুতি, তা শুনতে ভাল লাগলেও অত্যন্ত বাস্তব ও অর্থনৈতিক কারণেই তা সম্ভব নয়। বা সম্ভব হলেও একই কারণে উচিত নয়। তাই জনমোহিনী গিমিকে তিনি সচরাচর যেতে চান না। এক্তিয়ার বুঝে চলার চেষ্টা করেন। তাতে তাঁর পপুলিস্ট ইমেজ নাই-বা থাকল!

    ইতিহাস বলছে, দিল্লি শহরে ভারতের ক্যাপিটাল শিফ্টের পর থেকেই শহরটি নানাবিধ সুযোগ-সুবিধে পেয়ে এসেছে। রাজনীতির জাতীয় অঙ্গন হওয়ায় দেশের অন্যান্য মেট্রোপলিসের তুলনায় দিল্লির প্রতি নজর দেওয়া হয়েছে অপেক্ষাকৃত বেশি।

    ফলে, একটি মনস্তাত্ত্বিক গড়ন দেখা দিয়েছে শহরটির, দিল্লি সুযোগ-সুবিধে পেতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের প্রশ্রয় পাওয়া সন্তানদের যেরকম আচার-আচরণ হয়, দিল্লি শহরটিরও সেরকমই হয়েছে। স্পয়েল্ড অ্যান্ড প্যাম্পার্ড সিটি। তাই কেজরীবাল যখন বলছেন এটা কমিয়ে দেব, সেটা তুলে দেব, শহরবাসী তাঁর কথায়, তাঁর প্রতিশ্রুতিতে যারপরনাই আকৃষ্ট হয়ে পড়ছেন। তাঁকে দেখেই তাঁর পার্টিতে ভোট পড়েছে বিপুলসংখ্যক। মোদী মাত্র কয়েক মাস আগেই দেশ জয় করলেও হেরে গিয়েছেন একটি শব্দের কাছে- সাবসিডি। ভরতুকি। অনেক সময়ই অনেকে বলেন ‘একটু বেশি হয়ে গেল না!’ অর্থাত্‌, কোনও কিছুকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এমন এক রূপ দেওয়া, যা একদমই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কেজরীবালের সততা নিয়ে যে-রঙ্গ-রসিকতা, সেখানেও এই ভাবটিই কিন্তু স্পষ্ট, বোধহয় একটু বেশিই ‘সততা’ দেখাচ্ছেন তিনি। আর তা দেখাতে গিয়ে সরল, বাস্তব অর্থনীতিকেও ধর্তব্যের মধ্যে আনতে চাইছেন না। এটি কেজরীবালের সততা নাকি দূরদৃষ্টির অভাব, তা সময়ই বলবে।

You may like