Travelogue

হরিণের পায়ে পায়ে

প্রসেনজিৎ সিংহ

  • ব্যাপারটা ঘটল একরকম হঠাৎই। না বলে কয়ে। পরিকল্পনাহীন।

    খুব ভোরে দরজায় টোকা। তবে যেন একটু সন্তর্পণে। খুলে দেখি আমার কলেজের বন্ধু। মেরিল্যান্ডের ওলনিতে ওর বাড়িতে হপ্তান্তিক অবসর যাপন করছি। দুই ঠোঁটে তর্জনী চেপে ইশারা করল শব্দ না করতে। ফিসফিস করে বলল, ‘হরিণ!’ এবার বুঝে যাই আমার করণীয়। জয়বাবা ফেলুনাথের লালমোহন গাঙ্গুলির মতোই তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মিলিত সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে জানাই, ‘এক মিনিট।’

    ক্যামেরা বাগিয়ে ওর সঙ্গে গুটিগুটি পায়ে দাঁড়াই বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডমুখী দরজার সামনে। কাঠের পাল্লা সামান্য সরিয়ে বন্ধু দেখায়, ইয়ার্ডের ঘাসের জমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে চার-পাঁচটা হরিণ । দু’একটা তার মধ্যেই ঘাস খেতে শুরু করেছে। ছবি তুলতে গিয়ে ঘটল বিপত্তিটা। আর সেই বিপত্তিই দাঁড় করাল ইতিহাসের মুখোমুখি।

    সকালের হঠাৎ ঠান্ডায় বেজায় হাঁচিটাকে এমার্জেন্সি ব্রেক কষেও আটকাতে পারলাম না। নিতান্ত অনিচ্ছার গাড্ডায় গোঁত্তা খেয়ে শব্দটা হল কর্কশ ‘চিঁক’। ওইটুকুই যথেষ্ট। হরিণ ভাগলবা। যে ছবি উঠল তাতে হরিণ বলে চেনা যাচ্ছে এই পর্যন্ত। তার বেশি কিছু নয়।

    ওলনি ছবির মতো। ইতিহাসখ্যাত ব্রুকভিলের পাশেই। এ হচ্ছে সেই ব্রুকভিল, ১৮১৪ সালে ব্রিটেনের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধের সময় যা একদিনের জন্য মার্কিনদেশের রাজধানী ঘোষিত হয়েছিল। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে মন্টগোমারি কাউন্টির আশ্চর্য পেলব এই জনপদটি সবুজ ঘাসে ঢাকা। উদয়শঙ্করের হাতের মুদ্রার মতো ঢেউখেলানো জমি। আর তার উপর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে দূরে। দেখে মনে হতে পারে যেন ঢেউয়ের উপর ভাসছে জায়গাটা। দু’পাশে ছোটছোট বাড়ি। রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে দূরে। প্রতিটি বাড়ির মেলবক্স রাস্তার কাছে দাঁড় করানো। কোনও কোনও মেলবক্সের পাশে আরও একটি করে বাক্স। গায়ে লেখা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।’ খবরের কাগজ দেওয়ার জায়গা। সেই রাস্তা ধরেই বন্ধুর সঙ্গে এগিয়ে যাই। উদ্দেশ্য হরিণ দেখা।

    স্রেফ ওর বাড়ির ব্যাকইয়ার্ড পেরিয়েও যাওয়া যেত। কারণ, বাড়ির পিছনের লনটি পাহারা দিচ্ছে তিনটি চিরহরিৎ গাছ। তার ওধারেই জঙ্গল শুরু। কাঠের বেড়া নাকি ইচ্ছে করেই দেয়নি ও। তাতে একটা বিচ্ছিন্নতা গড়ে ওঠে। কুড়ি বছরের প্রবাসী মন হয়তো বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটু বেশিই স্পর্শকাতর। তবে এই ব্যবস্থায় মনে হচ্ছে, অরণ্যই যেন আগলে রেখেছে বাড়িটাকে।

    রাস্তাকে বিদায় দিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি ‘জাঙ্গল ট্রেল’-এ। চারপাশে লম্বা লম্বা গাছের ভিড়। বেশিরভাগই ওক। রুক্ষ আর বিদীর্ণ কাণ্ডের ধূষর রঙে চারপাশটা একটু একঘেঁয়ে। পাতা নেই, ফুল নেই। শুধু খোঁচা খোঁচা শাখাপ্রশাখা আকাশের দিকে তাকিয়ে। ওলনিতেই নয়, আমেরিকায় বসন্তের প্রথমে এই সময়টায় প্রথমে ফোটে চেরিব্লসম। তারপরে ড্যাফোডিল। একে একে অন্যেরা। শীতের পাতাঝরা রূপহীনতা ঘুচিয়ে মুকুল আসে। বুঝতে পারি, এই জঙ্গলে এখনও সেই সুদিন আসেনি। ওয়াশিংটন থেকে ফেরার পথে রাস্তার দু’পাশে দেখেছিলাম এমনই বনাঞ্চল। মনে হচ্ছিল কোন অজানা হাহাকারে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া পরিত্যক্ত ভূমি।

    হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখা হল এক শেয়ালের সঙ্গে । তিনি অবশ্য আমাদের দেখে চমকে উল্টোদিকে দৌড় দিলেন। কিছুদূর এগিয়ে আবিষ্কার করা গেল তার গর্তটিও। কিন্তু এসব তো ইতিহাস নয়। ভূগোল আর জীবনবিজ্ঞান। ইতিহাসও এল। এর কিছু পরেই। একটি ছোট্ট নালা পেরিয়ে যেখানে আমরা উঠলাম সেটার নাম ‘ওকলে কেবিন’। এককালে ক্রীতদাসদের বাসস্থান। কীভাবে যেন আজও টিকে গিয়েছে। তাই ‘লিভিং মিউজিয়াম’।

    সবরকম বাহুল্যবর্জিত একটা ঘর। নেহাতই সাদামাটা। ওক আর চেস্টনাটের গুঁড়ি আর ছোটবড় পাথর দিয়ে বানানো। দু’টি ঘর, গোটা চারেক জানলা। ঘরের সঙ্গে লাগোয়া একটা সিঁড়ি।

    ইতিহাস বলছে, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতে লোকজন বসবাস করেছে। কিন্তু একসময় এটাই ছিল ক্রীতদাসদের থাকার ঘর। যেটা দেখে খুব ভাল লাগল, এই একখণ্ড ইতিহাসকেও ধরে রাখার কী সুন্দর প্রয়াস! সামনে একটি বোর্ডে এ বাড়ির ইতিহাস, মালিকানা বদল থেকে শুরু করে এলাকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও সুন্দর করে লেখা। একঝলক কেউ পড়লেই তাঁর একটা স্পষ্ট ধারণা হবে এই সামান্য জায়গার গুরুত্ব সম্পর্কে।

    এই কেবিন হাতবদলের পরম্পরাটা খুব ছোট নয়। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তৈরি হয় ওকলে কেবিন। ওকলে ফার্মের অঙ্গ হিসাবেই। সেইসময় বিশাল খামার এবং কেবিনের মালিক ছিলেন রিচার্ড বি ডোরসে। ইনি উত্তরাধিকার সূত্রে এসবের মালিকানা পান। তাঁর দাদু কর্নেল রিচার্ড ব্রুক ছিলেন বিপ্লবী। আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাসে ‘ফাইটিং কোয়েকারস’দের একজন। ক্রীতদাস প্রথা উচ্ছেদে এই কোয়েকারদের ভূমিকা আমেরিকার মানুষ আজও স্মরণ করে।

    রিচার্ড ব্রুকের বাবা জেমস ১৭৬৭ সালে এই জায়গাটার পত্তন করেন। ১৮৩৬ সালে ডোরসে এক ধনী চিকিৎসক উইলিয়াম বাওয়ি ম্যাকগ্রুডারকে ৩০৮ একরের এই খামার বিক্রি করে দেন। পরবর্তীকালে, ১৮৬০ সালের জনগণনায় দেখা যাচ্ছে ম্যাকগ্রূডারের কাছে ৩০ জন ক্রীতদাস এবং দু’টি কেবিন ছিল। যার একটি এই ওকলে কেবিন।

    এই অঞ্চলে তখন ভুট্টা, সয়াবিন প্রভৃতির চাষ হত। এখনও কিছু কৃষি জমি রয়ে গিয়েছে। সভ্যতা একটু একটু করে তা গ্রাস করেছে। তবে এখানে সেই আগ্রাসনকে অন্তত বিপজ্জনকভাবে বলা যাবে না। দিব্যি সাজিয়েগুছিয়ে রাখায় চেষ্টায় ঘাটতি নেই। জঙ্গলকে জঙ্গলের মতোই রাখার চেষ্টা রয়েছে। আর তার মধ্যে একচিলতে এই কেবিনের যে নিঃসঙ্গতা, সেটাও মানুষকে নিমেষে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে নিয়ে যাবে।

    ক্যবিন থেকে কিছুটা দূরেই ব্রুকভিল রোড, আজও আছে। সেদিনও ছিল। আর ছিল লোকচলাচল। কৃষিকাজের মজুরি আর জিনিসপত্র বিক্রি করে চলে যেত তাদের সংসার। অতীতে  ক্রীতদাসেরা মূলত সেই কৃষিজমিতেই কাজ করতেন। তবে সকলে নয়। বাড়ি ঘর সামলানোর মতো কাজকর্মও ছিল। কাপড়কাচা বাসনমাজা, খাবার বানানো, নিয়মিত কাঠের জোগান দেওয়া-সহ নানাবিধ কাজ ছিল। আর তাদেরই অনুল্লিখিত নানা স্মৃতি নিয়ে ওকলে ক্যাবিন জীবন্ত জাদুঘর হয়ে রয়ে গিয়েছে। এই দ্রষ্টব্য এখন রয়েছে মন্টগোমারি কাউন্টির উদ্যান বিভাগের তত্ত্বাবধানে।

    হরিণের পিছু নিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তা শেষ হল ওকলে কেবিনে এসে। যাত্রাপথে শেয়াল দেখা দিলেও হরিণ আর নজরে আসেনি। তবে যা দেখা হল, জানা হল, তা সোনার হরিণের চেয়ে কম কীসে!